ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও যুদ্ধের জেরে অস্থির বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধের আবহ সরাসরি প্রভাব ফেলছে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ওপর। বিশ্ববাজারে তেলের দর বাড়ার ফলে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশও এই জ্বালানি সংকট থেকে রেহাই পাচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম ক্রমশ বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এবং তার কঠোর নীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় আমদানিকারক দেশগুলো এখন চিন্তিত। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতি জিইয়ে থাকায় তেলের মজুত এবং সরবরাহের পথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যারেল প্রতি দাম হু হু করে বাড়ছে। আমেরিকা, যা এতদিন জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতার অন্যতম উৎস ছিল, তারাও এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির মুখোমুখি। এর ফলে গাড়ি চালক থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সবাই জ্বালানির বর্ধিত মূল্যের কারণে বড়সড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে যদি বিচার করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার দরের ওপর। যদিও ভারতের জ্বালানি নীতি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব থেকে রাজ্যগুলোও মুক্ত থাকতে পারে না। রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যে এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরব হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, বর্তমান শাসক দল বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় সাধারণ মানুষের ওপর জ্বালানি তেলের এই বর্ধিত মূল্যের বোঝা চাপানো হচ্ছে। তারা দাবি করেছে, কেন্দ্রের ভুল নীতি ও বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের দুর্বল অবস্থানই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল বিজেপি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন এই অভিযোগ মানতে নারাজ। সরকারি সূত্র বলছে, বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম বাড়া একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চক্র। পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার যে অবনতি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত হলেও, রাজ্য সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থে ভর্তুকি বা কর হ্রাসের বিষয়টি নিয়ে সর্বদা সজাগ রয়েছে। রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয় বলেও দাবি করেছেন শাসক দলের নেতারা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল সাময়িক নয় বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলো এখন বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। তবে রাতারাতি এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান না ঘটছে এবং ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতারা তাদের নীতিতে ভারসাম্য না আনছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির থাকারই আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষকে এই উচ্চমূল্যের সঙ্গে লড়াই করতে আরও দীর্ঘ সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। ভারতে এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পণ্য পরিবহনের খরচের ওপর পড়ছে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।