বিশেষ প্রতিবেদন, তিরুবনন্তপুরম: আগামী ৯ এপ্রিল কেরালায় ভাগ্যনির্ধারক বিধানসভা নির্বাচন (kerala Election 2026)। কিন্তু এই লড়াই কি কেবল উন্নয়নের, নাকি একজন নেতার একাধিপত্যের? ধর্মডম থেকে তৃতীয়বারের জন্য লড়াইয়ে নামা মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকে ঘিরে এখন এই প্রশ্নই কেরালার রাজনৈতিক আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। বামপন্থার চিরাচরিত আদর্শ ছাপিয়ে কেরালা কি এখন এমন এক শাসনব্যবস্থাকে মান্যতা দিচ্ছে, যা গঠনগতভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘কেন্দ্রীয়করণ’ মডেলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়?
সেই পুরোনো রক্তঝরা ইতিহাস ও ‘নিউটন তত্ত্ব’
আশির দশকের শেষে কান্নুরের পরাসিনিকাদাভু স্নেক পার্কে ভয়াবহ হামলার স্মৃতি আজও অনেকের মনে টাটকা। রাজনৈতিক গুরু এম.ভি রাঘবন দল ছাড়ায় সিপিএম ক্যাডাররা নির্বিচারে পুড়িয়ে মেরেছিল অজস্র দুর্লভ সাপ ও বন্যপ্রাণী। তৎকালীন কান্নুর জেলা সম্পাদক পিনারাই বিজয়ন সেই নৃশংসতাকে ‘নিউটনের তৃতীয় সূত্র’ বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সমালোচকদের মতে, সেই দিনই বোঝা গিয়েছিল বিজয়নের রাজনীতিতে ‘প্রতিপক্ষকে দমন’ করার কৌশল কতটা আপসহীন। আজ সেই পদ্ধতি আরও পরিশীলিত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকট থেকে ‘ত্রাতা’ ইমেজ: মোদী মডেলের ছায়া?
২০১৮-র বন্যা, নিপা ভাইরাস এবং পরবর্তীতে কোভিড অতিমারি— এই প্রতিটি সংকটকে পিনারাই বিজয়ন ব্যবহার করেছেন নিজের ভাবমূর্তি গড়তে। প্রতিদিনের প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে রাজ্যের একমাত্র ‘অভিভাবক’ হিসেবে তুলে ধরেন। অধ্যাপক আজাদ মালায়াত্তিল ও লেখক এম.এন কারাসেরির মতো বুদ্ধিজীবীদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বিলীন হয়ে গিয়েছে। বিজয়ন নিজেই এখন ‘সিস্টেম’। ঠিক যেভাবে দিল্লিতে মোদী ব্র্যান্ডের প্রচার চলে, কেরালায় সরকারি অর্থে বাসে, হোর্ডিংয়ে, টিভিতে কেবলই পিনারাইয়ের মুখ। বিরোধী দলনেতা ভি.ডি সতীশন একে ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ প্রচারের সঙ্গে তুলনা করে বিঁধেছেন।
দলের অন্দরে বিদ্রোহ ও দুর্নীতির ছায়া
বিজয়নের এই একাধিপত্য মেনে নিতে পারেননি অনেক পুরনো সতীর্থ। একসময়ের ঘনিষ্ঠ জি. সুধাকরণ এখন ইউডিএফ সমর্থিত হয়ে অম্বলপুঝা থেকে লড়ছেন। সি.পি জন বা ভাস্করনদের মতো প্রাক্তনীরা মনে করছেন, শরিক দল সিপিআই এখন বিজয়নের অনুগত ভৃত্যে পরিণত হয়েছে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর মেয়ের ব্যবসায়িক লেনদেন এবং জামাতা পি.এ মহম্মদ রিয়াজকে মন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত ‘পরিবারতন্ত্রের’ অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
বিরোধ দমনে কড়া হাত
টি.পি চন্দ্রশেখরণ হত্যা থেকে শুরু করে ইউএপিএ (UAPA)-র প্রয়োগ— বিজয়নের শাসনামলে ভিন্নমত দমনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। যুব কংগ্রেসের কালো পতাকা দেখানোকে ‘জীবনদায়ী মিশন’ বলে পুলিশি নিগ্রহকে সমর্থন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সমালোচকদের মতে, এটি আসলে গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
উপসংহার: আদর্শ বনাম ক্ষমতা
কেরালা একসময় সমষ্টিগত নেতৃত্ব এবং বামপন্থী আদর্শের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু বিজয়নের এক দশকের শাসন সেই ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ৯ এপ্রিলের ভোট কেবল নতুন সরকার গড়ার নয়, বরং কেরালার মানুষ কি একজন ‘সর্বাধিনায়ক’ কেন্দ্রিক রাজনীতিকে গ্রহণ করবে, নাকি পুরোনো বামপন্থী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ফিরবে— তারই পরীক্ষা।








