জ্বালানির দামে স্বস্তি! কেন বাড়ছে না ভারতে তেলের দাম?

petrol-diesel-price-not hike in india

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের ওঠানামার মাঝেও ভারতে পেট্রোল, ডিজেল ও এলপিজি-র দামে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। যেখানে ইউরোপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম ৭০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে ভারত কেন এই ধরনের বড় ধাক্কা অনুভব করছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দেশের প্রায় ৮৮% অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও এই আপাত স্থিতিশীলতার পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিককালে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়েছে, যা বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। ঐতিহাসিক ভাবে, এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট তেলের দামকে আকাশছোঁয়া করে তোলে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আমদানিকারক দেশগুলিতে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রভাব ভারতে সেভাবে পড়েনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রধান কারণ হল ভারত সরকারের কিছু পূর্ব-পরিকল্পিত পদক্ষেপ এবং তেলের দামের উপর নিয়ন্ত্রণ। একদিকে, সরকার বিভিন্ন উপায়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের আকস্মিক বৃদ্ধি বা পতন থেকে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি তাদের খুচরো মূল্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে না। এই সংস্থাগুলি তাদের মুনাফার মার্জিন কমিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিগুলির সুবিধা নিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ভারত সরকারের ট্যাক্সেশন নীতি। জ্বালানির উপর আবগারি শুল্ক এবং অন্যান্য করের হার সরকারের হাতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও, সরকার চাইলে সেই করের হার কমিয়ে সাধারণ মানুষের উপর চাপ কমাতে পারে। যদিও এই মুহূর্তে সরকার করের হার নিয়ে কোনও বড় ঘোষণা করেনি, তবুও অতীতে এমন নজির আছে যেখানে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার কর কমিয়েছে।

এলপিজি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি-র দাম বেড়েছে, সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে গ্রাহকদের উপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে বা নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে এই দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

এছাড়াও, ভারত সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির উৎসের উপর জোর দিচ্ছে। যদিও এর প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হবে। বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি এবং অন্যান্য বিকল্প শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির উপরও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা কমাতে পারে।

তবে, এই স্থিতিশীলতা কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বাড়ে বা অন্য কোনও কারণে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়, তবে ভারতেও জ্বালানির দাম বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকার পরিস্থিতি নজরে রাখছে এবং প্রয়োজনে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু ইউরোপীয় দেশে জ্বালানির দাম প্রায় ৫০% পর্যন্ত বেড়েছে। আফ্রিকার কিছু দেশে এই বৃদ্ধি ৭০% ছাড়িয়েছে। এই তুলনায় ভারতের দাম স্থিতিশীল থাকাটা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক, যা দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, এমনটাই মত szakmullomomomolmom.om.