কলকাতা: দুর্গাপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণে যখন গোটা বাংলা উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে, তখন চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারে এক অভিনব ও সাহসী কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে সিপিআইএম। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুজোর মণ্ডপের আশেপাশে যে বইয়ের স্টলগুলি প্রতিবছর বামপন্থীরা আয়োজন করে থাকে, তাতে এবার ‘শারদোৎসব’-এর পরিচিত তকমার পরিবর্তে ‘প্রগতিশীল বইয়ের স্টল’ হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাম শিবির। এই বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা এবং বিশ্লেষণের পালা। রাজ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের মোকাবিলায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্বের টানাপোড়েনের মাঝে বামেদের এই পদক্ষেপকে এক বিশেষ ‘আইডিওলজিক্যাল’ বা আদর্শগত কৌশল হিসেবেই দেখছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাম নেতৃত্বের দাবি, বর্তমান সময়ে সমাজব্যবস্থায় যে নৈতিক অবক্ষয় এবং ধর্মীয় মেরুকরণের এক অস্বস্তিকর বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বইয়ের স্টলগুলোর মাধ্যমে মানুষের কাছে সঠিক ও যুক্তিবাদী বার্তা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। স্টলগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রেও তাই প্রথাগত উৎসবের মেজাজের চেয়ে চিন্তাশীল ও প্রগতিশীল ভাবধারাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে বিপুল বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বামপন্থীরা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্ট করার লক্ষ্যেই এই পথ বেছে নিয়েছে। তাদের মতে, উৎসবের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে বরং মানুষের মগজ ধোলাইয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার দিশা দেখানোই তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, কলকাতার বিভিন্ন বড় পুজোর মণ্ডপের কাছে, ব্যস্ততম মোড়ে কিংবা জনবহুল মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বামেদের এই স্টলগুলি বিশেষ যত্নে তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে মূলত মার্ক্সবাদী ধ্রুপদী সাহিত্য, বিশ্বখ্যাত সমাজতাত্ত্বিকদের লেখা বই, ইতিহাস চর্চার বই এবং সমসাময়িক রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থগুলো বিশেষভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। বাম নেতাদের মতে, রাজ্যে যে সাংস্কৃতিক আবহের বিপরীতে তারা লড়াই চালিয়েছিল, বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতার আবহেও তারা সেই লড়াইয়ের ভাষাকে বইয়ের পাতায় এবং প্রচারের মাধ্যমে জিইয়ে রাখতে চাইছে। বিরোধী দলের দায়িত্বে থেকে জনমত গঠনের যে দীর্ঘমেয়াদী কাজ তারা হাতে নিয়েছে, এই স্টলগুলি সেই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াসেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
উল্লেখ্য যে, অতীতে শারদ সংখ্যা বা উৎসবের সাহিত্যের আড়ালে অনেক সময় রাজনৈতিক এবং সামাজিক বার্তাগুলি চাপা পড়ে যেত বলে বামেদের একাংশের ধারণা। তাই এবার সচেতনভাবেই তারা ‘শারদোৎসব’ শব্দটি এড়িয়ে সরাসরি ‘প্রগতিশীল বইয়ের স্টল’ নামকরণের মাধ্যমে পথচলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কৌশল নিয়েছে। বাম কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, উৎসব মানেই শুধুমাত্র আনন্দ বা হৈ-হুল্লোড় নয়, বরং মানুষের অধিকার, সাম্য এবং সামাজিক সচেতনতার কথা বলারও একটি বড় সুযোগ। সেই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন তারা। তারা মনে করেন, মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
এই উদ্যোগ সম্পর্কে সিপিআইএম-এর এক প্রবীণ নেতা জানান, “আমরা কোনো ধর্মীয় বা সংকীর্ণ আবেগের ওপর ভিত্তি করে আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিচালনা করতে চাই না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা বাড়ানো এবং সমাজকে যুক্তির আলোয় দেখা। তাই উৎসবের আবহেও আমরা আমাদের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হব না।” স্টলগুলোতে সাধারণের নাগালের মধ্যে দাম রাখতে বিশেষ ছাড় দিয়ে বই বিক্রির ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যাতে ছাত্র-যুবক এবং নতুন প্রজন্মের পাঠকরা বেশি করে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপি যখন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তখন সিপিআইএম-এর এই ধরনের উদ্যোগ তাদের পুরনো ভিত্তি বা ‘বেস’ ধরে রাখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা হতে পারে। যদিও এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি—দুই প্রধান শক্তির লড়াইয়ে বামেরা কিছুটা কোনঠাসা, তবুও তারা নিজেদের একটি আলাদা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চাইছে। সব মিলিয়ে এবারের পুজোয় বইয়ের স্টলগুলো ঘিরে বামেদের এই অভিনব প্রচার কৌশল এখন রাজনীতির অন্দরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যদিও স্টলগুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যা বা আয়োজক কমিটির বিস্তারিত তালিকা এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি, তবুও প্রতিটি জেলায় সমান উদ্যমে এই ধরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মানুষ এই বইয়ের স্টলগুলোতে কতটা সাড়া দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।








