কলকাতা শহরের বিভিন্ন সংশোধনাগারে বিচারাধীন ইউএপিএ (UAPA) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা এবার সরব হয়েছেন তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের অনুমতির দাবিতে। সাম্প্রতিক এই দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসনের অন্দরেও নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। মূলত, পরিবারের সদস্যদের দাবি, আইনি জটিলতার কারণে মাসের পর মাস বন্দিরা বাইরের জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকছেন, যার ফলে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিশেষ শ্রেণির বন্দিদের জন্য টেলিফোন বা ভিডিও কলে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষ এবং উচ্চপদস্থ মহলে আলোচনা চলছে বলে খবর।
উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই সমস্ত সংবেদনশীল মামলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কড়াকড়ি বজায় রাখার নীতি নিয়েছে। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই ধরণের বন্দিদের অধিকার এবং জেলখানার অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা বর্তমান প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়টি নিয়ে সরব হয়ে কারাবন্দিদের মানবিক অধিকারের প্রশ্নটি সামনে এনেছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, অভিযুক্ত প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা অমানবিক।
তবে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কর্তারা এই বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। পুলিশের উচ্চপদস্থ সূত্রের খবর, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ থাকে। জেল কোড অনুযায়ী, তাদের অবাধে যোগাযোগের সুযোগ দিলে তদন্তে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষ করে ইউএপিএ-এর মতো কঠোর আইনের আওতায় যারা বন্দি আছেন, তাদের ক্ষেত্রে জেল প্রশাসনের নিয়মকানুন বেশ কঠোর হয়। এই বন্দিদের ফোন ব্যবহারের আবেদন সরাসরি খারিজ না করলেও, তা নিরাপত্তার নিরিখে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, হাইকোর্ট বা নিম্ন আদালতে মামলা চলাকালীন তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুব সীমিত। কারাগারের ভিজিটরস রুমে গিয়ে দেখা করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি ফোনের মাধ্যমে মাসে অন্তত কয়েক মিনিট কথা বলার অনুমতি পাওয়া যায়, তবে তারা মানসিকভাবে কিছুটা সুস্থ থাকতে পারবেন। এই আর্জি নিয়ে ইতিমধ্যে আইনজীবীদের একটি অংশ মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। এদিকে, কারাদপ্তরের অন্দরে খবর, প্রতিটি বন্দির ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা অতীত অপরাধের ইতিহাস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অন্তর্ঘাতের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
পশ্চিমবঙ্গের কারা ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও, এই ধরনের স্পর্শকাতর মামলায় জেল কর্তৃপক্ষ সাধারণত কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-এর যেসব মামলা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কারাদপ্তরের একার হাতে থাকে না। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা এবং রাজ্য সরকারের নীতি—এই দুইয়ের সমন্বয়েই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। আপাতত এই আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়নি। তবে বন্দিদের আত্মীয়দের এই আন্দোলন যে আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তার খাতিরে ফোন ব্যবহারের সুযোগ সীমিত রাখা হলেও, মানবিক দিক থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। জেলখানায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করাও শাসনব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিজেপি সরকার এবং বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে যে মতপার্থক্য তৈরি হবে, তা বলাই বাহুল্য। পুরো বিষয়টি এখন স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নথিপত্রে সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং দ্রুত কোনো সুরাহার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন কারাসূত্রের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আইনি খুঁটিনাটি বা আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি।








