তেলেঙ্গানা পুলিশের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই মাওবাদী দমনে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছিল। সম্প্রতি প্রবীণ মাওবাদী নেতা দেবুজি এবং তাঁর আরও কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে বিভ্রান্তিকর তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। পুলিশের একটি সূত্র থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, তাঁরা লড়াইয়ের পথ ছেড়ে মূল স্রোতে ফেরার লক্ষ্যে আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিয়েছে। দেবুজি নিজে মুখ খুলেছেন এবং জানিয়েছেন যে আত্মসমর্পণের খবরটি একেবারেই ভিত্তিহীন।
দেবুজির বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বা তাঁর সঙ্গীরা স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে ধরা দেননি। বরং নির্দিষ্ট কৌশলে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের শর্ত মেনে জেলের বাইরে থাকার যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছিল, সেই প্রসঙ্গেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন নিজের অবস্থান। তাঁর দাবি, পুলিশ তাঁদের সামনে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত রেখেছিল। সেই শর্তগুলি মেনে নেওয়ার ফলেই তাঁদের সরাসরি জেল হেফাজতে না রেখে নজরদারির মধ্যে বাইরে রাখা হয়েছে। তবে এই পুরো বিষয়টিকে কোনওভাবেই ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন।
তেলেঙ্গানা পুলিশের এই বিশেষ কৌশলী অবস্থান নিয়ে মাওবাদী আন্দোলনের অন্দরেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দেবুজি ও তাঁর সঙ্গীদের জেলের বাইরে থাকার সুযোগ দেওয়ার বদলে পুলিশ আসলে কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। দেবুজি সাফ জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, প্রশাসনিকভাবে বিষয়টিকে যেভাবে পেশ করা হয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। গ্রেফতারির পর জেলের বাইরে থাকার যে সমঝোতা হয়েছে, তা নেহাতই পুলিশের দেওয়া একটি বিশেষ শর্তের ফল।
পুলিশের একটি মহলের মতে, দেবুজির মতো বর্ষীয়ান নেতাদের গ্রেফতারের পর তাঁদের মাধ্যমে সংগঠনের গোপন ডেরা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দেবুজি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে পুলিশের সাজানো নাটক হিসেবেই দেখছেন। তাঁর অভিযোগ, জনগণের চোখে মাওবাদী আন্দোলনকে দুর্বল হিসেবে দেখাতেই এই ‘সারেন্ডার’ বা আত্মসমর্পণের তত্ত্বটি খাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের গ্রেফতারির সঠিক নথি বা পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে এটি আসলে একটি পরিকল্পিত গ্রেফতারি ছাড়া আর কিছুই নয়।
বর্তমানে এই প্রবীণ নেতা এবং তাঁর সহযোগীরা মুক্ত অবস্থায় থাকলেও তাঁদের ওপর কড়া পুলিশি পাহারা রয়েছে। পুলিশের দেওয়া বিশেষ শর্তগুলো ঠিক কী ছিল, তা নিয়ে কোনও পক্ষই বিস্তারিত কিছু খোলসা করতে চায়নি। তবে দেবুজির এই প্রকাশ্য বয়ান পুলিশের ভাবমূর্তিকে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একদিকে সরকার যখন মাওবাদীদের মূল স্রোতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন একজন উচ্চপদস্থ নেতার এমন পালটা দাবি মাওবাদী দমনের সরকারি প্রচারের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেবুজির এই জবানবন্দি আগামী দিনে মাওবাদী দমন অভিযানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ যদি আত্মসমর্পণের ঘটনাটি বিতর্কিত হয়ে পড়ে, তবে অন্যান্য সক্রিয় মাওবাদীরা পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিতে দ্বিধাবোধ করবেন। দেবুজি বর্তমানে জেলের বাইরে থাকলেও তাঁর এই বিস্ফোরক দাবি ঘিরে রাজ্য পুলিশের অন্দরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এই ঘটনার রেশ ধরে আগামী দিনে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও পাল্টা বিবৃতি দেওয়া হয় কি না, এখন সেটাই দেখার।







