
বিশেষ সংবাদদাতা: চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভোট কারচুপি, সহিংসতা এবং সাধারণ মানুষের নির্বাচন বয়কটের আহ্বানের মধ্যেই পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে (পিওজেকে) বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। এর মাধ্যমে দীর্ঘ এক দশক পর ওই অঞ্চলে পুনরায় ক্ষমতার মসনদে ফিরল শরিফ পরিবার।
সহিংসতা ও বয়কটের মুখে জয়ের পরিসংখ্যান
আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, মোট ৩৪টি আসনের মধ্যে ২৪টিতেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে পিএমএল-এন। যদিও আগামী ১০ আগস্ট আরও ১১টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, তবে তার আগেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদু সংখ্যা ২৩ অতিক্রম করে ফেলেছে ক্ষমতাসীন দলটি। কর্তৃপক্ষ মুজাফফরাবাদসহ একাধিক অঞ্চলে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোটদানের দাবি করলেও, নির্বাচনজুড়ে ছিল ব্যাপক জালিয়াতি ও সহিংসতা।
রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক পরিবেশ ও ‘জেএএসি’-র বয়কট
অঞ্চলটিতে পাকিস্তানের আগ্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে এবং বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত সংগঠন ‘জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি) এই নির্বাচন সম্পূর্ণ বয়কটের ডাক দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি থেকে আন্দোলন শুরু হলেও, তা দ্রুতই ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও পাক সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
চলমান এই আন্দোলনে সরকারের নির্দয় দমন-পীড়নে রক্তে ভেসেছে পিওজেকে। জেএএসি-র দাবি অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রথম দুই দিনেই সরকারি বাহিনীর হামলায় ৩০ জন নিহত হয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই দমন-পীড়নে এ পর্যন্ত অন্তত ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুরো অঞ্চলে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং কঠোর তথ্য-নিষেধাজ্ঞা (ব্ল্যাকআউট) বজায় থাকায় প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা বের করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
মিত্র দলের তীব্র তোপ: কাঠগড়ায় পিএমএল-এন
জোট সরকারের শরিক হলেও নির্বাচন ঘিরে পিএমএল-এন-এর বিরুদ্ধে তীব্র তোপ দাগিয়েছেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি। তিনি অভিযোগ করেন, শরিফ পরিবার “গুলি, লাঠিচার্জ ও জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে জনগণের ভোট ছিনিয়ে নিয়েছে।” বিলাওয়ালের মতে, পিএমএল-এন পিওজেকে-র স্থানীয় প্রধানমন্ত্রীর মূল ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একটি “কাশ্মীর-বিরোধী” এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী পদে থেকেও জনগণের কাছে নতুন করে ভোট চাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা শরিফ পরিবারের নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভারতের অবস্থান
১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর দেশীয় রাজ্যে পাকিস্তান অবৈধ আগ্রাসন চালানোর পর মহারাজা হরি সিং ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই সময় কাশ্মীরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করে নেয় পাকিস্তান। ভারত এই পুরো অঞ্চলটিকে ‘পিওজেকে’ (PoJK) হিসেবে অভিহিত করে এবং এটিকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে। পাকিস্তান বর্তমানে এই অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’ (এজেকে) এবং ‘গিলগিট-বালতিস্তান’-এ বিভক্ত করে রেখেছে। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ‘শাকসগাম উপত্যকা’ পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে বেআইনিভাবে চীনের হাতে তুলে দেয়, যা শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে নয়াদিল্লি।






