কলকাতা: কলকাতা হাইকোর্ট সম্প্রতি পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (EKW) সংরক্ষণের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং এই এলাকাটি রক্ষায় আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসনের পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই জলাভূমিটি ক্রমাগত দখল ও অবৈধ নির্মাণের কবলে পড়ছে। বিচারপতিরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। পরিবেশকর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে, জলাভূমি ভরাট করে সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। এই এলাকাটি কলকাতার ‘কিডনি’ হিসেবে পরিচিত কারণ এটি শহরের বর্জ্য জল প্রাকৃতিক উপায়ে শোধন করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশের নজরদারি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে উচ্চ আদালত। মামলার শুনানিতে উঠে আসে যে, রাতের অন্ধকারে একরের পর একর জলাভূমি ভরাট করা হচ্ছে। বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন এই ধ্বংসলীলা রুখতে কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই আদালত আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েনের চিন্তাভাবনা করছে যাতে সরাসরি কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে এলাকাটি সুরক্ষিত রাখা যায়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে জলাভূমি ভরাটের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে দুষ্কৃতীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। হাইকোর্ট জানিয়েছে যে, তারা কেবল মৌখিক নির্দেশে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং মাঠ পর্যায়ে কাজের বাস্তবায়ন দেখতে চায়। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলাভূমি এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো এবং স্থায়ী চেকপোস্ট তৈরি করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। আগামী শুনানির মধ্যে রাজ্য সরকারকে এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে যেখানে স্পষ্ট করতে হবে কেন বর্তমান পরিকাঠামো এই এলাকা রক্ষায় ব্যর্থ। কলকাতা হাইকোর্টের এই কঠোর অবস্থান পরিবেশ প্রেমীদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। আধা-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ভূ-মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য কমাতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জলাভূমি সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্য নেওয়ার এই প্রস্তাব একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত হতে পারে যা ভবিষ্যতে অন্যান্য পরিবেশগত মামলার ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। আইনজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় পরিবেশ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিক ও প্রশাসনের মৌলিক অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণেই আজ সর্বোচ্চ আদালতকে এই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। রাজ্য বন দপ্তর এবং পরিবেশ দপ্তরকেও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি রাজ্য পুলিশ বাহিনী একা এই বিশাল এলাকা সামলাতে না পারে, তবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে থাকা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই মামলার পরবর্তী পর্যায়ে ঠিক হবে কত দ্রুত এবং কত সংখ্যক কেন্দ্রীয় জওয়ান এই স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন করা হবে। শহরের বাস্তুসংস্থান বজায় রাখতে এই জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর সামান্য ক্ষতিও কলকাতার ভবিষ্যৎ বিপন্ন করতে পারে। আদালতের এই সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।







