কলকাতা: প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালাবদলের পর থেকেই বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ। গত ১ মার্চ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে ফেরার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ইসলামাবাদ পাড়ি দিলেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স’ (DGFI)-এর নবনিযুক্ত প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান নৈকট্য ঘিরে ইতিমধ্যেই দিল্লির কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
ঝটিকা পাকিস্তান সফর: নেপথ্যে কোন ছক?
ঢাকার উচ্চপদস্থ সূত্রের খবর অনুযায়ী, বুধবার থাই এয়ারওয়েজের বিমানে ব্যাংকক হয়ে পাকিস্তান পৌঁছেছেন মেজর জেনারেল চৌধুরী। সঙ্গে রয়েছেন সংস্থার আরও তিন পদস্থ আধিকারিক। দুই দিনের এই সফরে পাকিস্তানের সেনা শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর প্রধানের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম কোনো সামরিক শীর্ষস্তরের প্রতিনিধি পাকিস্তানে গেলেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক এক মাসের মাথায় এই ইসলামাবাদ সফরকে ‘কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দিল্লির অস্বস্তি: শিষ্টাচার ও নিরাপত্তা
মেজর জেনারেল চৌধুরীর ভারত সফর নিয়েও কিছু বিতর্ক দানা বেঁধেছে। জানা গেছে, নয়াদিল্লি সফরকালে সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর দেওয়া নৈশভোজের আমন্ত্রণ তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের আবহে এই ধরণের আচরণ এবং তার পরপরই পাকিস্তানের সঙ্গে ‘গোপন’ সলাপরামর্শ দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
হাদি হত্যাকাণ্ড ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ
আঞ্চলিক গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় মোড় এসেছে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)-এর একটি অভিযানে। গত ৮ মার্চ উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুই মূল অভিযুক্ত— ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে।
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে:
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনে গুলি চালিয়ে অভিযুক্তরা দেশ ছাড়ে।তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে অসম হয়ে কলকাতায় গা ঢাকা দিয়েছিল। উভয় দেশের ‘কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য’ আদান-প্রদানের মাধ্যমেই এই সাফল্য এসেছে।
পরিবর্তিত সমীকরণ ও ভারতের দুশ্চিন্তা
মোহাম্মদ ইউনুস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আইএসআই-এর সঙ্গে বাংলাদেশের গোয়েন্দা প্রধানের এই সরাসরি যোগাযোগ দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা বলয়কে নাড়িয়ে দিতে পারে।সাউথ ব্লকের এক আধিকারিকের কথায়, “ভারত সবসময় প্রতিবেশী দেশের স্থিতিশীলতা চায়। কিন্তু গোয়েন্দা প্রধানের পাকিস্তান সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সীমান্তে অনুপ্রবেশ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ নিয়ে আমরা সতর্ক। এই সফরের গতিপ্রকৃতি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে।”
সব মিলিয়ে, ঢাকার বর্তমান প্রশাসনের বৈদেশিক নীতি কি দিল্লির বদলে ইসলামাবাদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে? উত্তর ২৪ পরগনায় গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের যোগসূত্র আর পাকিস্তানের আইএসআই-এর সঙ্গে ডিজিএফআই প্রধানের বৈঠক—এই দুই বিন্দুর মাঝে কোনো অদৃশ্য রেখা আছে কি না, এখন সেটাই খতিয়ে দেখছে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।







