আদালতের নির্দেশে কাটল জট, খুঁটিপুজো সম্পন্ন বাগবাজার সর্বজনীনে

কলকাতার দুর্গাপূজার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলির মধ্যে অন্যতম বাগবাজার সর্বজনীন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মঙ্গলবার উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপে সম্পন্ন হলো খুঁটিপুজো। উৎসবের মরসুম শুরুর এই প্রথাগত আচার পালনের মাধ্যমে শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রস্তুতির আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। এবারের খুঁটিপুজোকে কেন্দ্র করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এক বিশেষ উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে।

গত বেশ কিছুদিন ধরে ক্লাব পরিচালন সমিতির নির্বাচন ও প্যানেল গঠন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এক জটিল আইনি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। এই বিবাদের জেরে পুজোর প্রস্তুতি শুরু করা নিয়ে দেখা দিয়েছিল ঘোর অনিশ্চয়তা। বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। অবশেষে আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ এবং আইনি জট কাটতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ক্লাবের সদস্যরা ও দুর্গাপূজা প্রেমীরা। আদালতের পর্যবেক্ষণে নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত হওয়ায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ দ্রুত খুঁটিপুজোর দিনক্ষণ নির্ধারণ করে।

মঙ্গলবার সকালে সমস্ত রীতি মেনে ও পুরোহিতের উপস্থিতিতে পুজোর খুঁটি পোঁতা হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের প্রবীণ সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা। দীর্ঘদিনের পরম্পরা বজায় রেখে এ বছরও আড়ম্বরের সঙ্গেই যে মা দুর্গার আরাধনা হবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। আদালতের রায়ের পর পরিবেশ এখন অনেকটাই শান্ত এবং সমস্ত বিতর্ক সরিয়ে এখন পুজোর প্রস্তুতির দিকেই নজর দিচ্ছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তার আঁচ বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের ওপরও পড়ে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার রাজনৈতিক সমীকরণের আবহেও বাগবাজার সর্বজনীনের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের অরাজনৈতিক সত্তাকে বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি, আর তৃণমূল কংগ্রেস রয়েছে বিরোধী অবস্থানে। এই রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহেই কলকাতার জনজীবনে দুর্গাপূজার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

বাগবাজার সর্বজনীনের খুঁটিপুজো মানেই কলকাতার শারদ উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানকার প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা দেখতে ভিড় জমান বহু মানুষ। গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও দর্শকদের নিরাপত্তা ও সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে পুলিশ ও প্রশাসন। আইনি জটিলতা মিটে যাওয়ার ফলে মণ্ডপ নির্মাণের কাজ এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হবে। যদিও এবারের পুজোর বাজেট ও থিমের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খুব শীঘ্রই মহালয়ার পর থেকে মণ্ডপসজ্জার কাজ চূড়ান্ত আকার নেবে।

কলকাতার এই পুরোনো উত্তরী ঐতিহ্যের ক্লাবটিতে প্রতি বছরই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ঠাকুর দেখতে আসেন। খুঁটিপুজো সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে কার্যত পুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল। ক্লাবের তরফে জানানো হয়েছে, আইনি বাধার সময় তারা যে সহমর্মিতা সাধারণ মানুষের কাছে পেয়েছেন, তাতে তারা অভিভূত। সমস্ত মতভেদ ভুলে বাগবাজারের পুজোকে সার্বজনীন করে তোলাই এখন তাঁদের মূল লক্ষ্য। প্রশাসনিক নিয়মবিধি মেনে এবার মণ্ডপে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

শহরের অন্যান্য বড় পুজোর তুলনায় বাগবাজার সর্বজনীন তাদের সাবেকিয়ানার জন্য পরিচিত। এবারের পুজোয় বিশেষ কোনো নতুনত্ব বা চমক থাকছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে পাড়ায় পাড়ায়। তবে ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। আদালতের নির্দেশে প্যানেল ভোটের যে প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, তাতে ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক অস্থিরতার অবসান হয়েছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। পুজোর আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিবাদের জেরে ম্লান না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন। আগামী দিনে উৎসবের দিনগুলিতে জনসমাগম সামাল দিতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তুতিও চলছে। সব মিলিয়ে আদালতের রায়ের পর বাগবাজারের খুঁটিপুজো যেন এক নতুন আশার আলো নিয়ে এল উত্তর কলকাতার পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে।