বাগবাজারের পুজোয় কাটল জট, খুঁটি পুজোয় মেতে উঠলেন উদ্যোক্তারা

কলকাতা তথা উত্তর কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো হলো বাগবাজার সার্বজনীন। দীর্ঘ টানাপোড়েন এবং আইনি জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে স্বমহিমায় ফিরল এই বারোয়ারি পুজো। সম্প্রতি আদালতের হস্তক্ষেপে পুজোর পরিচালনার জন্য গঠিত প্যানেল নির্বাচন সংক্রান্ত অচলাবস্থা কাটতেই বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির তরফে আয়োজিত হলো খুঁটি পুজো। পুজোর প্রস্তুতির এই সূচনালগ্নে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এক অন্যরকম উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেল। গত কয়েক মাস ধরে পুজো কমিটির অভ্যন্তরীণ নির্বাচন এবং পরিচালনার প্যানেল গঠন নিয়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, তা দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোর ফলে পুজোর প্রস্তুতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে আদালতের সাম্প্রতিক রায় এবং জট কাটিয়ে পুজো কমিটি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় বাগবাজারের ঐতিহ্যবাহী এই শারদোৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

খুঁটি পুজোর অনুষ্ঠানে ক্লাবের প্রবীণ সদস্য থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা, সকলেই উপস্থিত ছিলেন। ঢাকের আওয়াজ আর উলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে মণ্ডপের মূল কাঠামোর খুঁটি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। এই পুজোকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ বরাবরই তুঙ্গে থাকে। এবছরও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। পুজো কমিটির অন্যতম এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইনি জটিলতা মিটে যাওয়ায় এখন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হলো প্রতিবারের মতো এবছরও ধুমধাম করে মা দুর্গার আরাধনা করা। বাগবাজারের পুজো মানেই বাঙালির নস্টালজিয়া এবং বনেদিয়ানা। গত কয়েক বছর ধরে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও বাগবাজারের পুজোর জৌলুস কমেনি। এবছরের থিম এবং আলোকসজ্জা নিয়ে এখনই রহস্য বজায় রেখেছেন উদ্যোক্তারা। তবে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন যে, বিগত বছরের তুলনায় এবারের মণ্ডপসজ্জা আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যের শাসকদল বিজেপি। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই পুজোর শুরু থেকেই সার্বিক নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাগবাজারের এই ঐতিহ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুজো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন, বাগবাজারের মতো পুজো সর্বজনীন ঐতিহ্যের ধারক হয়েই থেকেছে। খুঁটি পুজোকে কেন্দ্র করে এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুজোর দিনগুলোতে যাতে ভিড় সামলানো যায়, তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হবে।

পুজোর প্যানেল ভোট সংক্রান্ত আইনি সমস্যার সমাধান হওয়ায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ কিছুটা স্বস্তিতে। যদিও এই পুরো প্রক্রিয়ায় ঠিক কতজন সদস্য অংশ নিয়েছিলেন বা ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল কী ছিল, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা পরিসংখ্যান আপাতত প্রকাশ্যে জানানো হয়নি। তবে খুঁটি পুজোয় সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিভেদ ভুলে সকলে পুজো সফল করতে একজোট হয়েছে। উত্তর কলকাতার সংকীর্ণ গলিগুলোতে পুজোর সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। রাস্তার ধারের দোকানগুলো থেকে শুরু করে প্যান্ডেল তৈরির সরঞ্জাম আসার শব্দ—সবমিলিয়ে পুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে বাগবাজার এলাকায়। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য পুজোর দিনগুলোতে কী কী বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে, তা নিয়েও আগামিদিনে বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

উল্লেখ্য, বাগবাজারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু ইতিহাস ও স্মৃতি। বহু বিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছে এই পুজো। তাই আইনি জটিলতার সমাপ্তি ঘটায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। এখন শুধুমাত্র মা দুর্গার আবাহনের প্রতীক্ষা। পুজোর দিনগুলো যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কাটে, সেই লক্ষ্যে প্রশাসন এবং পুজো কমিটি যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। বাগবাজারের এই খুঁটি পুজো কেবল একটি প্রথা নয়, এটি শহরবাসীর কাছে পুজোর আগমনের এক অঘোষিত বার্তা। উত্তর কলকাতার বুকে ফের একবার মেতে ওঠার অপেক্ষায় বাগবাজার সার্বজনীন। খুঁটি পুজোর মাধ্যমে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এখন মূল পুজোর প্রস্তুতির দিকেই নজর দিচ্ছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। এই ঐতিহ্য যেন আগামী বহু বছর একইভাবে বজায় থাকে, সেই কামনাই করছেন এলাকার আপামর জনসাধারণ। পুজোর মণ্ডপের নির্মাণকাজও দ্রুত শুরু হবে বলে আশাবাদী কর্মীরা। শহরের অন্যান্য বড় পুজোগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে এবছরও বাগবাজার তার পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখবে বলেই স্থানীয়দের বিশ্বাস। পুজোর দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো এবং মণ্ডপের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন উদ্যোক্তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আদালতের রায়কে সম্মান জানিয়ে এবং সমস্ত আইনি নিয়ম মেনে পুজোর পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুজো কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ।