দার্জিলিং পাহাড়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড়সড় রদবদল ঘটাল রাজ্য সরকার। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ-র পরিচালনার দায়িত্বভার আপাতত একজন প্রশাসকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, পাহাড়ের উন্নয়নমূলক কাজে কোনো রকম দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।
সোমবার রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এক নির্দেশিকা জারি করে জানানো হয়েছে যে, জিটিএ-র বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এনে একজন অভিজ্ঞ আমলাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরেই পাহাড়ের এই সংস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। বিরোধী দল টিএমসি-র পক্ষ থেকেও নানা সময়ে জিটিএ-র আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই নতুন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এবং পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য ছিল বলে দাবি করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “পাহাড়ের মানুষ শান্তি এবং উন্নয়ন চান। জিটিএ-র কাজকর্মে যে ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দায়িত্ব নিয়ে পাহাড়ের মানুষের প্রতিটি পয়সার হিসাব নেব। প্রশাসনিক কাজে যারা বাধা সৃষ্টি করবে বা সরকারি তহবিলের অপব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, বিগত দিনের সরকার অর্থাৎ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে অব্যবস্থা পাহাড়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় শিকড় গেড়েছিল, তা উপড়ে ফেলাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।
পাহাড়ের পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে জিটিএ-তে প্রশাসক বসানোর পর স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দল টিএমসি এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় সরব হয়েছে। তারা একে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, সাধারণ পাহাড়বাসীর একাংশ মনে করছেন যে, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কঠোর হলে কাজের গতি বাড়বে।
উল্লেখ্য যে, জিটিএ-র কাজকর্ম গত কয়েক মাস ধরেই রাজ্য সরকারের নজরদারিতে ছিল। অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্টে বেশ কিছু গরমিলের ইঙ্গিত পাওয়ার পরেই নবান্ন এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। সূত্রের খবর, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হতে পারে। পাহাড়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল, তার সঠিক উপযোগিতা খতিয়ে দেখতে নতুন প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে জিটিএ-র যে রাজনৈতিক মডেল তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়কে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফেরানোই বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, পাহাড়ের পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় উন্নতির জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। খুব শীঘ্রই পাহাড়ের প্রতিটি মহকুমায় সরকারি প্রকল্পের সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
এই মুহূর্তে জিটিএ-র নতুন প্রশাসককে ঘিরে পাহাড়ের রাজনীতির পারদ চড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসক দল বিজেপি পাহাড়ের জনমানসে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে এই স্বচ্ছতার কার্ডটি ব্যবহার করতে চাইছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে তারা টিএমসি-র প্রাক্তন প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চায়। আগামী দিনে এই প্রশাসনিক বদলের ফলে পাহাড়ের রাজনীতি ও উন্নয়ন কোন পথে যায়, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে সাধারণ মানুষ আশা করছেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পাহাড়ের প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ফিরবে এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছাবে। কোনো প্রকার অস্থিরতা যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের সার্বিক শান্তি বজায় রাখাই এখন সরকারের কাছে প্রধান অগ্রাধিকার।








