কলকাতার দুর্গাপুজোর আঙিনায় এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল রাজ্য। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে কলকাতার একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও বড় পুজো কমিটি এবছর সরকারি অনুদান গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে। দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে প্রশাসনিক স্তরে এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের পুজো কমিটিগুলিকে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার রীতি চালু ছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে এই ধারা শুরু হয়েছিল। তবে চলতি বছর রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব বদলের পর পটচিত্র অনেকটাই ভিন্ন। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সরকারি কোষাগারের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। সেই সুরেই তিনি সম্প্রতি পুজো কমিটিগুলিকে অহেতুক সরকারি অর্থের উপর নির্ভর না করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছিলেন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়েই শহরের প্রথম সারির পুজো কমিটিগুলি এই বছরে সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করার পথে হেঁটেছে।
সূত্রের খবর, উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার অন্তত বেশ কয়েকটি বড় বাজেটের পুজো কমিটি ইতিমধ্যেই সরকারি অনুদান না নেওয়ার বিষয়ে নিজেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা সরকারি দপ্তরকে জানিয়ে দিয়েছে। পুজো উদ্যোক্তাদের একাংশের মতে, রাজ্যের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং মুখ্যমন্ত্রীর স্বচ্ছ প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান জানাতেই তারা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, বড় পুজো কমিটিগুলি স্বাবলম্বী হলে ছোট ক্লাবগুলি সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান থেকে বেশি উপকৃত হতে পারবে। এতে পুজোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত হবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এতদিন ধরে বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস এই সরকারি অনুদান প্রদানের প্রক্রিয়াকে নিয়ে সরব ছিল। কিন্তু এখন ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের আমলে পুজো কমিটিগুলির এই ভূমিকা রাজ্যের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার একটি প্রতিফলন হিসেবেই দেখছে শাসক শিবির। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এই ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে পুজো অনুদান ছিল একটি বড় রাজনৈতিক চাল, বর্তমান সরকার সেই জায়গা থেকেই সরে আসার চেষ্টা করছে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের।
শহরের নামী পুজো কমিটিগুলির এই সিদ্ধান্তের পর অন্য ছোট ক্লাবগুলিও একই পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে এখন নানা মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি করা হয়নি বলে নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এটি পুরোপুরি ঐচ্ছিক বিষয়। যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম, তারা অনুদান প্রত্যাখ্যান করলে তা সাধুবাদযোগ্য। কলকাতার দুর্গাপুজো এখন বিশ্বজনীন। ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর থেকেই এই উৎসবের মান বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুজো কমিটিগুলির এই স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা উৎসবের মর্যাদাকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন শহরের নাগরিক সমাজ।
প্রশাসনের অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, যেসব পুজো কমিটি অনুদান নেয়নি, তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও কিছু পুজো কমিটি একইভাবে নিজেদের অনুদান বাতিলের ঘোষণা করতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। উৎসবের এই মরসুমে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ কমানোর এই মানসিকতা রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত বহন করে। পুজোর প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। প্যান্ডেল তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তার মধ্যেই বড় পুজো কমিটিগুলির এই পদক্ষেপ বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে এক নতুন মাত্রা দিল। কলকাতার বড় পুজো মানেই থিম ও জাঁকজমকের লড়াই। সেই লড়াইয়ের ময়দানে এবার আর্থিক স্বচ্ছতার এক নতুন ইশতেহার তৈরি হল। সমস্ত পুজো কমিটি শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই ঘটনা নিশ্চিতভাবেই কলকাতার পুজো ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।








