৬০ কোটি টাকার অনিয়ম, তৃণমূল সাংসদ নাদিমুলের অফিসে ইডির তল্লাশি

কলকাতা: রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি ও বিপুল আর্থিক তছরুপের ঘটনার শিকড় খুঁজতে আবারও পূর্ণ উদ্যমে ময়দানে নেমেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তল্লাশি অভিযানের মাধ্যমে তদন্তের জাল বিস্তার করছে তারা। এরই ধারাবাহিকতায়, দীর্ঘ প্রায় ২৪ ঘণ্টার এক ম্যারাথন তল্লাশি অভিযানের পর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ নাদিমুল হকের কলকাতার দপ্তরে হানা দিয়ে গোয়েন্দারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন। ইডি সূত্রের দাবি, এই তল্লাশি অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকার এক বিশাল আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে এখন প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গিয়েছে, গতকাল সকালের দিকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বিশাল কনভয় নিয়ে ইডির পদস্থ আধিকারিকরা সাংসদ নাদিমুল হকের কলকাতার দপ্তরে পৌঁছান। দপ্তরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে অন্দরমহল পর্যন্ত মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ফেলেন জওয়ানরা। এরপর টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে চলে নথিপত্র ঘেঁটে দেখার কাজ। গোয়েন্দাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাংসদের দপ্তরে থাকা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের খতিয়ান, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং বিভিন্ন ভুঁয়া বা সন্দেহভাজন সংস্থার সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের নথিপত্র খুঁজে বের করা। সূত্র মারফত আরও জানা যাচ্ছে, দপ্তরে রক্ষিত বেশ কিছু কম্পিউটার হার্ড ড্রাইভ, ডিজিটাল ডেটা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তিপত্র বাজেয়াপ্ত করেছেন আধিকারিকরা। দীর্ঘ এক দিন ও এক রাত দপ্তরের ভেতরে আটকে থেকে যখন ইডি আধিকারিকরা বাইরে বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁদের হাতে ছিল বাজেয়াপ্ত করা নথিপত্রের বড় বড় ব্যাগ। যদিও সরকারিভাবে ইডির পক্ষ থেকে এই অভিযানের প্রেক্ষিতে এখনও কোনো বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি, তবে নথিপত্র উদ্ধারের ঘটনাটি তদন্তের ক্ষেত্রে বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অভিযানকে ঘিরে শুরু হয়েছে কথার লড়াই। একদিকে বিজেপি ও বিরোধী শিবিরের নেতারা দাবি করছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতার নীতি বজায় রেখেই কাজ করছে। তাঁদের বক্তব্য, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং যারা দুর্নীতিতে জড়িত, তাদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে পুরোপুরি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করেছে। তৃণমূল নেতাদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার জন্য এবং তৃণমূলের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করতেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করার জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে শাসকদলের দাবি। তবে ইডির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তাদের হাতে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রাথমিক প্রমাণ রয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের অনিয়মের সঙ্গে আর কারা কারা জড়িত বা নেপথ্যে কোনো বড় চক্র সক্রিয় আছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই গোয়েন্দারা তদন্তের পরিধি বাড়িয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে কয়লা পাচার এবং গরু পাচারের মতো চাঞ্চল্যকর কাণ্ডে রাজ্যের বহু হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম জড়িয়েছে। এবার সরাসরি একজন রাজ্যসভার সাংসদের দপ্তরে তল্লাশি এবং বিপুল নথি উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওই অফিসে ঠিক কোন সময় থেকে তল্লাশি শুরু হয়েছিল এবং সেখানে ঠিক কী কী গোপন তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তা নিয়ে গোয়েন্দারা আপাতত মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তদন্তকারী আধিকারিকদের সূত্রে জানা গেছে, বাজেয়াপ্ত করা নথিগুলো ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে। সেই রিপোর্ট হাতে আসার পরেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়তেই তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। গতকাল সকাল থেকেই সাংসদের দপ্তরের বাইরে দলীয় নেতা-কর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি কলকাতা পুলিশকেও অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছিল কড়া নিরাপত্তা বলয়ে। আজ বিকেলে ইডির দলটি যখন দপ্তর থেকে নথিপত্রের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসেন, তখনও পরিস্থিতির উত্তাপ ছিল চরমে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই মামলার প্রয়োজনে সাংসদ নাদিমুল হককে তলব করা হতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, এই ঘটনা যে রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে একটি বড় ও গভীর প্রভাব ফেলতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে রাজ্যবাসী।