দীর্ঘ দুই দশক ধরে মূলধারার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর অবশেষে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিন মাওবাদী নেতা। রাজ্যের জঙ্গলমহল এবং সংলগ্ন এলাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে তারা আত্মগোপন করেছিলেন। গোপন সূত্রে খবর, চলতি সপ্তাহেই পুলিশের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির দাবি, দীর্ঘদিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অরণ্যে জীবন কাটানোর ফলে তাদের শারীরিক অবস্থা এখন বেশ সংকটজনক। সেই কারণেই মূলস্রোতে ফিরে আসার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তারা।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জঙ্গলমহলের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বিগত দিনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে মাওবাদী সমস্যা মোকাবিলায় একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কথা শোনা গেলেও, বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা অস্ত্র ত্যাগ করে উন্নয়নের পথে ফিরতে চায়, তাদের জন্য পুনর্বাসনের সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে। তবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ বিশ বছর আগে মাওবাদী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এই তিন ব্যক্তি গভীর অরণ্যের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে জঙ্গলমহলের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। পুলিশের খাতায় দীর্ঘ সময় ধরে তাদের নাম ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিল। বিভিন্ন সময়ে তারা একাধিক নাশকতামূলক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে তারা কীভাবে সরকারি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় শামিল হবেন। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য এই আত্মসমর্পণের নেপথ্যে রাজনৈতিক অভিসন্ধির অভিযোগ তোলা হয়েছে।
প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত কয়েক মাস ধরেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পুলিশের সঙ্গে এই তিন নেতার যোগাযোগ চলছিল। তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরেই প্রকাশ্যে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জঙ্গলমহলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শান্তি বজায় রাখতে রাজ্য প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট। বর্তমান সরকারের আমলে গত কয়েক বছরে জঙ্গলমহলের চিত্র আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিকাঠামোর উন্নতির ফলে মাওবাদী মতাদর্শের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
সূত্রের খবর, এই তিন সদস্যের আত্মসমর্পণের ফলে মাওবাদী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। এছাড়া আত্মগোপনকারী অন্যান্য সদস্যদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তবে দীর্ঘদিনের পুরনো মামলাগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। আইনজীবী মহল মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রে খবর, আত্মসমর্পণকারী এই তিন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের কাছ থেকে সংগঠনের বর্তমান গোপন আস্তানা এবং আর্থিক লেনদেনের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবেন গোয়েন্দারা।
পুরো বিষয়টি নিয়ে এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরণের কৌতূহল এবং উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশক পর পুরোনো পরিচয়ে তাদের গ্রামে ফেরার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শান্তি বজায় রাখার জন্য ওই এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে মাওবাদী সমস্যার চূড়ান্ত অবসান হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক অব্যাহত। আপাতত সবার নজর এখন পুলিশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে। আত্মসমর্পণ পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হবে কি না, সেই উত্তর সময় দেবে।








