শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অপমান, বিজেপির অন্দরেই কোণঠাসা রেখা পাত্র

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও অস্বস্তিতে শাসক দল বিজেপি। সন্দেশখালির পরিচিত মুখ তথা বিজেপির নেত্রী রেখা পাত্র এবার নিজের দলের একাংশের বিরুদ্ধেই গুরুতর অভিযোগ তুললেন। তাঁর অভিযোগ, দলেরই কিছু সহকর্মী তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বারবার তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছেন। লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই রেখা পাত্রের উত্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই সাফল্যের আবহে কালি লাগাল দলের অন্দরেরই অপমানজনক আচরণের খবর।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক সভায় এবং অভ্যন্তরীণ আলোচনার সময় রেখা পাত্রকে তাঁর পড়াশোনা বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব নিয়ে কটু কথা শুনতে হয়েছে। রেখার অভিযোগ, দলের উচ্চপদস্থ নেতাদের একাংশ তাঁকে যোগ্যতার নিরিখে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আর সেখানেই তাঁর আসল পরিচয়। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হওয়াটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।

রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারে যখন বিজেপি তাদের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়েই এই ধরনের অভ্যন্তরীণ বিবাদ দলের অন্দরে বড়সড় ফাটল ধরানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় সন্দেশখালির ঘটনার পর থেকে রেখা পাত্র একটি প্রতীকী মুখ হয়ে উঠেছিলেন। সেই ভাবমূর্তি বজায় রাখার পরিবর্তে দলের কর্মীদের একাংশ যেভাবে তাঁর পিছু লেগেছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই সুযোগে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘নারীবিদ্বেষী’ মানসিকতার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে।

রেখা পাত্র নিজে জানিয়েছেন যে, তিনি তৃণমূল স্তরের লড়াই থেকেই উঠে এসেছেন। বইয়ের পাতার শিক্ষার চেয়েও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তিনি গুরুত্ব দেন। কিন্তু দিনের পর দিন দলের নেতাদের কাছ থেকে এই ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য শুনতে হওয়ায় তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছেন। যদিও বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সরকারিভাবে এখনও কোনো বিস্তারিত বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে দলের অন্দরেই রেখা পাত্রের এই ক্ষোভ প্রকাশ কার্যত রাজ্য রাজনীতির অন্দরমহলের নোংরা ছবিটিকে সামনে নিয়ে এল।

উল্লেখ্য যে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে। এই অবস্থায় নিজের দলের নেত্রীর এমন বিস্ফোরক অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি বাড়িয়েছে রাজ্য নেতৃত্বের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রেখা পাত্রের মতো মুখগুলোকে সামনে রেখে বিজেপি যে প্রচারের আলোয় আসার চেষ্টা করেছিল, এখন সেই মুখগুলোই যদি দলের অন্দরের নোংরামির বিরুদ্ধে সরব হয়, তবে তা আসন্ন দিনগুলোতে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে।

রেখা পাত্র আরও অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপেই সংশয় এবং বাঁকা মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না বা এড়িয়ে চলা হচ্ছে। তিনি এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে জানিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই বিবাদ যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে সন্দেশখালির আন্দোলনের যে সুফল বিজেপি পেতে চেয়েছিল, তা থেকে তারা পুরোপুরি বঞ্চিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত উত্তপ্ত। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ের বিভিন্ন দুর্নীতি এবং ইস্যুগুলো নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এমনিতেই চাপে রয়েছে। তার ওপর বিজেপির নিজের ঘরে এই ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব শাসক দলের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেখা পাত্র কি শেষ পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকবেন, নাকি এই অপমানের বদলা নিতে অন্য কোনো পথ বেছে নেবেন—তা নিয়ে এখন জল্পনা তুঙ্গে। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এবং বিজেপি রাজ্য নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ সংশ্লিষ্ট মহল। আগামী কয়েকদিন এই বিষয়টি নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বড় ধরনের তোলপাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।