‘বাবা’ সম্বোধন ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত, কমিশনের দ্বারস্থ কংগ্রেস

কলকাতার রাজনৈতিক আবহে ‘বাবা’ সম্বোধনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক কিছুতেই থামার নাম নিচ্ছে না। শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে এই ইস্যুকে ঘিরে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন নতুন মোড় নিয়েছে। রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আসীন রয়েছেন। অন্যদিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে এই বিতর্ক ক্রমাগত বড় আকার ধারণ করছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এবার এই বিষয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছে কংগ্রেস।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রচারের আঙিনায় এই ধরনের সম্বোধন আসলে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, শাসকদলের মদতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করছে, যা রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। অন্যদিকে, শাসকদল বিজেপির দাবি, এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং এর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তারা এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত কয়েকদিন আগে এক জনসভায়। সেখানে কিছু সমর্থক রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ভঙ্গিতে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করেন। এই ঘটনা ক্যামেরাবন্দি হতেই তা সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণই নয়, বরং এটি নারীদের অসম্মান করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে তৃণমূলের প্রশ্ন, কেন এ ধরনের ঘটনার পরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?

তৃণমূল কংগ্রেসের এই অবস্থানের বিপরীতে কংগ্রেসের সক্রিয়তা বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, রাজনীতির ময়দানে মতাদর্শগত লড়াই হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনোই কাম্য নয়। দলীয় স্তরে আলোচনা করার পর কংগ্রেস নেতৃত্ব স্থানীয় থানায় এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাদের দাবি, এই ধরনের কুরুচিকর শব্দবন্ধ প্রয়োগ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের একের পর এক কর্মসূচি এবং অন্যদিকে শাসকদল বিজেপির পাল্টা দাবি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরিচয় বা লিঙ্গকে কেন্দ্র করে যে ধরনের মন্তব্য বা সম্বোধন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আদতে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। শহরের নাগরিক সমাজও এই ঘটনায় যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, রাজনৈতিক নেতাদের উচিত শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হওয়া।

তবে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের তরফ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তবে ঠিক কোন কোন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে বা অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে বিশদ তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। আগামী কয়েক দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।

এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই ‘বাবা’ সম্বোধনটি শুধুমাত্র একটি শব্দে আটকে নেই, বরং এটি এখন রাজ্যের প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি দ্রুত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে তারা বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবে। অন্যদিকে, শাসকদল বিজেপি নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে এই বিতর্ক যে আগামী কয়েকদিন আরও বড় আকার ধারণ করবে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই অভিযোগের ভিত্তিতে ঠিক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।