কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র কামাক স্ট্রিটে ঘটা সাম্প্রতিক অশান্তির ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ বেড়েই চলেছে। এই ঘটনার তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলেন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন। সোমবার তাকে ফের তলব করে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। সূত্রের খবর, এদিন টানা ছয় ঘণ্টা ধরে ডেরেককে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। এই দীর্ঘ জেরা পর্বের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, বেশ কিছুদিন আগেই কামাক স্ট্রিটে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই ঘটনার পর থেকেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, তাদের নেতাদের হেনস্তা করার উদ্দেশ্যেই পুলিশকে কাজে লাগানো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার এই ধরনের অশান্তি বরদাস্ত করা হবে না বলে আগেই জানিয়েছিলেন।
সোমবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডেরেক ও’ব্রায়েনকে লালবাজারের সদর দপ্তরে দেখা যায়। বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে তিনি সেখানে পৌঁছান। সকালের দিকে শুরু হওয়া এই জিজ্ঞাসাবাদ চলে বিকেল পর্যন্ত। তদন্তকারী দল মূলত কামাক স্ট্রিট কাণ্ডের সেই দিন ডেরেকের ভূমিকা কী ছিল এবং ওই ঘটনার নেপথ্যে কার নির্দেশে লোকজন জড়ো হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত তথ্য জানতে চায়। দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডেরেক ও’ব্রায়েনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, তদন্ত প্রক্রিয়া যে আরও বড় মোড় নিতে চলেছে তা স্পষ্ট।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে ব্যবহার করার মতোই এখন রাজ্য পুলিশকেও বিরোধী দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বর্তমান সরকার। দলের প্রবীণ নেতাদের এমনভাবে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে বাধ্য করা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলেই মনে করছে বিরোধী শিবির। যদিও পুলিশের দাবি, ঘটনাটির তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে এবং কোনো প্রভাবশালীর নাম উঠে এলে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এই ধরনের তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেতারা। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে রাজ্যের শাসনভার বিজেপির হাতে এবং তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আসনে রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের তদন্তের মাত্রাও বদলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কামাক স্ট্রিটের ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ধৃত ব্যক্তিদের বয়ানের সঙ্গে ডেরেকের বয়ান মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার রাজপথে আগামী দিনে বড় ধরনের আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব। অন্যদিকে, শাসক দল বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, কামাক স্ট্রিটের ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে সরকারিভাবে খুব বেশি মুখ খোলা হয়নি। তবে ডেরেকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পরবর্তী তদন্তের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বোঝা যাচ্ছে, কলকাতা পুলিশের এই তৎপরতা কেবল কামাক স্ট্রিট কাণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন নেতা ও কর্মীকে তলব করা হতে পারে বলে জল্পনা শোনা যাচ্ছে। ডেরেকের ৬ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদের পর বিরোধী দলগুলি নিজেদের পরবর্তী রণকৌশল স্থির করতে বৈঠক শুরু করেছে। রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নে বর্তমান সরকার কতটা আপসহীন, তা এই তদন্তের পরিণতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপাতত শহরবাসীর নজর এখন লালবাজারের আগামী পদক্ষেপের দিকে। ঘটনার বাকি খুঁটিনাটি বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে রাজ্যবাসী।








