কলকাতা: উত্তপ্ত বিরাটি, সিপিএমের কর্মীসভায় দুষ্কৃতী হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তুঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা
কলকাতা শহরতলির অদূরে উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে ফের একবার রাজনৈতিক অস্থিরতার কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। বিরাটি এলাকায় সিপিএমের একটি সাধারণ সাংগঠনিক কর্মীসভাকে কেন্দ্র করে যে হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। বুধবার বিকেলের সেই ঘটনার জেরে এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার বিকেলে। সিপিএমের স্থানীয় শাখার পক্ষ থেকে বিরাটি এলাকায় একটি নিয়মিত কর্মীসভার আয়োজন করা হয়েছিল। দলীয় সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, সভায় যখন স্থানীয় স্তরের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীরা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক তখনই আচমকা একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী সভাস্থলে চড়াও হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দুষ্কৃতীদের হাতে লাঠিসোঁটা, লোহার রড এবং ধারালো অস্ত্র ছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা এলোপাথাড়ি আক্রমণ শুরু করে বলে অভিযোগ। এই হামলায় সিপিএমের বেশ কয়েকজন কর্মী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আক্রান্তদের রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার জন্য নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্বের তরফে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দলের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে তাদের শান্তিপূর্ণ সভা পণ্ড করার এক হীন প্রচেষ্টা। সিপিএম নেতাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরেই বিরাটি এলাকায় বামেদের সাংগঠনিক কার্যকলাপ ক্রমবর্ধমান, যা শাসকদলের একাংশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই আক্রোশ থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন। যদিও এই হামলার নেপথ্যে বিজেপির নাম জড়িয়ে সিপিএমের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বাদানুবাদ।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানবন্দর থানার বিশাল পুলিশবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বিরাটি এলাকায় সিপিএমের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। দলীয় কর্মীরা রাস্তা অবরোধ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
বিপরীত দিকে, স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সিপিএমের এই সমস্ত অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। বিজেপির জেলা স্তরের এক নেতার কথায়, “সিপিএমের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে ধামাচাপা দিতে তারা অহেতুক বিজেপির নাম জড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।” শাসকদলের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক দেউলিয়া দশা ঢাকতেই তারা বিজেপির দিকে আঙুল তুলছে।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিরোধী দল হিসেবে সিপিএম নিজেদের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় দলই একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিককালে বাংলার ভোটব্যাঙ্ক এবং রাজনৈতিক মেরুকরণে যে পরিবর্তন এসেছে, তার জেরেই বিরাটির মতো এলাকায় প্রায়শই এমন সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই এলাকায় রাজনৈতিক চাপা উত্তেজনা ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অহেতুক রাজনৈতিক অশান্তি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এই ঘটনায় রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও প্রকট হয়েছে। আজ সন্ধে পর্যন্ত এলাকায় পুলিশি প্রহরা রয়েছে এবং নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি। তবুও থমথমে পরিবেশ বজায় রয়েছে বিরাটিতে।
হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি যুক্ত ছিল এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশি তদন্তের পরেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঘটনাটি যে আগামী দিনে উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতির বাতাবরণ আরও তপ্ত করে তুলবে, তা বলাই বাহুল্য। বাম ও বিজেপি উভয় শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বিবৃতি দেয়নি। এলাকার সাধারণ মানুষ এখন শুধু এটাই চাইছেন যে, রাজনৈতিক দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে বিরাটিতে শান্তি ফিরে আসুক এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত না হোক। তদন্তের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সকলের।








