লাদাখের সো মরিরিতে বেআইনি অফ-রোডিং, ১২ বাইকারকে জরিমানা ১.২ লক্ষ

লাদাখের অতি সংবেদনশীল এবং পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সো মরিরি হ্রদ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেআইনিভাবে অফ-রোডিং করার দায়ে ১২ জন বাইকারকে কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও লাদাখ পুলিশ সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিয়মভঙ্গকারী ওই ১২ জন বাইকারের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে অভিযুক্তদের কাছ থেকে।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি ওই বাইকারদের একটি দল লাদাখের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণের নামে নিয়ম বহির্ভূত কাজ করছিলেন। সাধারণত সো মরিরির মতো সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকায় সাধারণের যাতায়াত এবং যানবাহনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়মাবলী রয়েছে। হিমালয়ের উচ্চতাজনিত এই বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি এবং মাটির গঠন এতটাই ভঙ্গুর যে, সামান্য অসতর্কতা বা মানুষের অযাচিত পদচারণা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মাটির ক্ষয় রোধ করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন সেখানে পর্যটকদের নির্দিষ্ট পথের বাইরে বাইক বা অন্য কোনো যান নিয়ে প্রবেশ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। তবে অভিযোগ, সেই সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুড়ি মেরে উড়িয়ে ওই বাইকাররা হ্রদের কাছাকাছি সংরক্ষিত এলাকায় বেআইনিভাবে অফ-রোডিং শুরু করেন। এতে যেমন ওই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তেমনই স্থানীয় নিয়ম-কানুনের প্রতি চরম অবজ্ঞার নজিরও তৈরি হয়।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। লাদাখ পুলিশ এবং পরিবেশ রক্ষা কমিটির সদস্যদের তৎপরতায় ওই বাইকারদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপরই জরিমানার নির্দেশ কার্যকর করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, হিমালয়ের কোলে অবস্থিত লাদাখের এই ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষা করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। কোনো পর্যটক বা ভ্রমণকারী যদি অ্যাডভেঞ্চারের দোহাই দিয়ে অথবা স্রেফ শখের বশে প্রকৃতির ক্ষতি করার চেষ্টা করেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন কোনোভাবেই পিছপা হবে না।

উল্লেখ্য, লাদাখের পর্যটন ক্ষেত্রটি ইদানীংকালে বিশ্বজুড়ে বাইকারদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ এখানে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের জন্য ছুটে আসেন। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ এবং নির্জন প্রান্তর বাইকারদের কাছে স্বপ্নের মতো। কিন্তু এই অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশকে যে বিপন্ন করা যাবে না, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রচার চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মূল রাস্তা ছেড়ে বাইকাররা মাটির ওপর দিয়ে বাইক চালিয়ে নিয়ে যান। এই ধরণের কর্মকাণ্ডের ফলে মাটিতে চাকার গভীর দাগ তৈরি হয় এবং মাটির উপরের স্তরের যে সূক্ষ্ম উদ্ভিদকূল থাকে, তা ধ্বংস হয়ে যায়। মরুভূমি অঞ্চলে এই ধরণের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া মাটির গুণমান নষ্ট হওয়া এবং ভূ-ক্ষয়ের মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে।

এই ঘটনার পর লাদাখ প্রশাসন পর্যটকদের জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের বেআইনি কাজের পুনরাবৃত্তি হলে জরিমানার পাশাপাশি আরও কঠোর আইনি শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, পর্যটন লাদাখের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড, এতে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু পরিবেশের বিনিময়ে সেই পর্যটন কোনোভাবেই কাম্য নয়। অভিযুক্ত বাইকারদের পরিচয় এবং তারা কোন রাজ্যের বাসিন্দা, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তবে প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপকে স্থানীয় পরিবেশপ্রেমীরা ও সচেতন নাগরিকরা সাধুবাদ জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লাদাখের বাস্তুতন্ত্র এতটাই স্পর্শকাতর যে, সেখানে কোনো ধরণের অনিয়ম প্রকৃতির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসন সম্মিলিতভাবে পরিবেশ রক্ষার যে বার্তা দিচ্ছে, তা পর্যটকদের মনে গেঁথে নেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে লাদাখে যে কোনো ধরণের অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়মাবলী এবং পরিবেশ রক্ষার বিধিনিষেধ মেনে চলাই যে একমাত্র পথ, তা এখন স্পষ্ট। পর্যটকরা যেন মনে রাখেন, পাহাড় বা হ্রদ ভ্রমণের আনন্দ যেন প্রকৃতির ধ্বংসের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। দায়িত্বশীল পর্যটনই লাদাখের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি। প্রশাসনের এই কড়া বার্তা ভবিষ্যতে অন্য পর্যটকদের জন্যও একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।