সিকিমে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে সুড়ঙ্গ ধসের ঘটনায় উদ্ধারকাজ এখনও নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ওই ধসে পড়া সুড়ঙ্গ এলাকা থেকে মোট ২০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও ১১ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও লাগাতার বর্ষণের ফলে পার্বত্য এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও সংকটময় আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছেন। ক্রমাগত বৃষ্টির ফলে মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় নতুন করে ধসের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যা উদ্ধারকার্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়া রাজ্যগুলিতে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের জন্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিকিমের যে এলাকায় সুড়ঙ্গ ধসের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ধসের কারণে রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলির ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরুতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগিয়ে চলেছে। উদ্ধার করা দেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে যাতে পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজদের খোঁজ পেতে পারেন।
উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতির দিকেও রাজ্য প্রশাসনের কড়া নজর রয়েছে। পাহাড় এবং সমতলের বিভিন্ন প্রান্তে ধস এবং বন্যার জেরে বেশ কিছু এলাকা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ১১ জনের দেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার চেষ্টা চলছে। বন্যার কারণে বহু মানুষ গৃহহীন হয়েছেন, তাদের জন্য সরকারি স্কুল এবং কমিউনিটি হলগুলিতে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে পানীয় জল, ওষুধ এবং শুকনো খাবারের জোগান দেওয়া হচ্ছে বলেও প্রশাসন দাবি করেছে। স্থানীয় পঞ্চায়েত ও ব্লক প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েকদিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বজায় থাকতে পারে এবং ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেই কারণে পর্যটকদের পার্বত্য এলাকায় যাতায়াত করতে কড়া বারণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নদী তীরবর্তী এবং ধসপ্রবণ এলাকা থেকে দ্রুত সরে গিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন এবং কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সব ধরনের সাহায্য নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিটি ব্লকে একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে যাতে পরিস্থিতির ওপর তদারকি সহজ হয়।
নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে, উদ্ধারকাজে কোনো রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছে। ধসের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখার জন্য ভূতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ দল গঠনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে গোটা এলাকায় এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় মানুষের মধ্যেও গভীর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের তরফে সর্বস্তরের মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এলাকায় মোতায়েন থাকবে।
ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে। উদ্ধারকাজের পরবর্তী ধাপ ও মৃতদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকেন। দুর্গম এলাকাগুলিতে সেনাবাহিনীর সাহায্যও প্রয়োজন হলে নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ পরিষেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও দ্রুত কাজ চলছে। সরকারের তরফ থেকে এই কঠিন সময়ে রাজ্যবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে।








