বাংলায় খ্রিস্টানদের ওপর পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ, সরব বঙ্গীয় খ্রিস্টীয়

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলল ‘বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা’। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং তাঁদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশানা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন সংগঠনের পদাধিকারীরা। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং ধর্মীয় মেরুকরণের আশঙ্কা করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

শনিবার আয়োজিত একটি সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, গত কয়েক দিনে রাজ্যের কয়েকটি জেলায় খ্রিস্টানদের প্রার্থনালয় ও ধর্মীয় মিছিলে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় দুষ্কৃতীরা এবং কিছু গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের অশান্তি তৈরি করছে। সংগঠনের তরফে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিপন্থী এবং এর বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

যদিও রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে বিরোধী আসনে রয়েছে এবং ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের জমানায় এই ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে এই ধরনের অভিযোগ উঠলে তা রাজনৈতিক তরজায় রূপ নিত, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার দাবি, অভিযোগ জানানোর পরেও স্থানীয় প্রশাসন সব ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে না, যা তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য সদস্যরা জানিয়েছেন, তাঁরা এ বিষয়ে রাজ্যপালের দ্বারস্থ হতে পারেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হামলার রিপোর্টগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও তথ্য পাঠানো হতে পারে। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি মহলের তরফে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশের তরফে অবশ্য বলা হয়েছে, যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ পেলে তা আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে শাসক দলের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিতে পারে। অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্ব বরাবরই দাবি করে আসছে যে, রাজ্যে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকারের সাথে বসবাস করছেন এবং কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী আক্রমণের শিকার নয়। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝেই খ্রিস্টান সংগঠনের এই দাবি নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

উল্লেখ্য যে, অতীতেও বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব বা উপাসনালয়ে হামলার অভিযোগ নিয়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এবারের অভিযোগটি বেশ সুনির্দিষ্ট এবং এটি একটি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম থেকে আসায় এর গুরুত্ব রাজনৈতিক মহলে অনেকটাই বেশি। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের দাবি, অবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তাঁরা। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা রাজ্য সরকারের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন তাঁরা।

বর্তমানে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এমনিতেই বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস সোচ্চার। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই অভিযোগগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু সংগঠনের প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা। পুলিশি সূত্রের খবর, যেসব নির্দিষ্ট অঞ্চলের নাম অভিযোগের তালিকায় রয়েছে, সেখানে নজরদারি বৃদ্ধি করার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কোন কোন ঘটনায় এফআইআর দায়ের হয়েছে বা কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এখনো পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়নি। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর পুলিশ সুপারদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।