উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় এক নাবালিকাকে ধর্ষণ এবং নৃশংসভাবে খুনের ঘটনার পর যে এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে, তা বর্তমানে রাজ্যজুড়ে প্রবল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনার রেশ ধরে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অপরাধী প্রহ্লাদ দাসের মৃত্যুতে একদিকে যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অনেক ভুক্তভোগী পরিবার, অন্যদিকে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্কও তীব্রতর হয়েছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার তরুণী চিকিৎসকের মা তথা বর্তমানে বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। তিনি এনকাউন্টারের প্রতি নিজের সরাসরি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, নারী নির্যাতনকারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের কড়া পদক্ষেপই একমাত্র পথ। রত্না দেবনাথ অত্যন্ত মর্মাহত অবস্থায় বলেন, “আমার মেয়ের সাথে যা ঘটেছিল, গাইঘাটার এই কিশোরীর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে। এমন নৃশংস অপরাধের সাথে যারা জড়িত, তাদের বেঁচে থাকার নৈতিক অধিকার নেই।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, অপরাধীদের মনে যখন এই এনকাউন্টারের ভয় তৈরি হবে, তখনই সমাজে নারী নির্যাতনের হার কিছুটা হলেও কমবে। তিনি অভিযুক্তের মায়ের প্রতি সমবেদনা জানিয়েও এই মন্তব্য করেন যে, মা হিসেবে ছেলেকে সঠিক পথে গাইড করার দায়িত্ব তাঁরই ছিল, যা তিনি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
রত্না দেবনাথের এই বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি রাজ্যের ক্রমবর্ধমান মদ্যপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের বাড়বাড়ন্ত নিয়েও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বেশিরভাগ অপরাধের নেপথ্যে মদ্যপানের নেশা বা মাদকাসক্তি একটি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তাই অবিলম্বে রাজ্যজুড়ে নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রি ও সেবন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তিনি মনে করেন, সমাজ থেকে অসামাজিক কাজ নির্মূল করতে হলে কেবল এনকাউন্টার নয়, সামগ্রিক সামাজিক সংস্কার এবং মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করা সমান জরুরি।
এদিকে, কামদুনির দীর্ঘদিনের লড়াই চালিয়ে আসা নির্যাতিতার পরিবারও এই ঘটনায় এনকাউন্টারের পক্ষেই সুর চড়িয়েছে। কামদুনি নির্যাতিতার ভাই এই ঘটনাকে অপরাধ দমনে ‘সঠিক ওষুধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আক্ষেপের সুরে জানান যে, কামদুনি মামলায় জড়িত অনেক অভিযুক্তই এখনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে জেলের বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা জেলের ভেতর থেকে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। তাঁর দাবি, এই অপরাধীদের জন্য আইনি বিচারব্যবস্থার চেয়ে এনকাউন্টারই বেশি কার্যকর। তাঁর এই মন্তব্য বুঝিয়ে দেয়, সাধারণ মানুষের একাংশ বিচারব্যবস্থার ধীর গতির ওপর কতটা আস্থা হারিয়েছে।
ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে রাজ্য পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী— অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসকে নিয়ে অপরাধের পুনর্নির্মাণ বা রিক্রিয়েশন করতে যাওয়ার সময় সে এক সাব-ইন্সপেক্টরের সার্ভিস রিভলভার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং পুলিশের দিকে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থেই পুলিশ পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়, যার ফলে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়। এটি গত তিন মাসে বারুইপুরের পর রাজ্যের দ্বিতীয় এনকাউন্টারের ঘটনা হওয়ায় বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যেও এই নিয়ে নানা প্রশ্নের উদয় হয়েছে। পুলিশি কৌশলের এই ধরন নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে ‘দ্রুত বিচার’ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে সমালোচনা করছেন।
গাইঘাটার এই এনকাউন্টারের পর কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নারী নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের শাস্তি নিয়ে এক নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং এনকাউন্টারের প্রতি তাদের সমর্থন, অন্যদিকে আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন— এই দুইয়ের দোদুল্যমানতায় প্রশাসন বর্তমানে এক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন। সরকার এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ঘটনাকে কীভাবে সামাল দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রাজ্যের সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি, এই ধরনের ঘটনায় পুলিশি বয়ান কতটা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে, তা নিয়েও জনমানসে এক বিশাল কৌতূহল এবং সংশয় দানা বেঁধেছে। আগামীর দিনগুলিতে প্রশাসন এই ধরনের জঘন্য অপরাধ দমনে কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, এবং রত্না দেবনাথের দাবিমতো মাদক বিরোধী কোনো ठोस পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো রাজ্যবাসী।








