রাজ্যের ক্ষুদ্র চা চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হলো কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্মল টি অ্যাসোসিয়েশন বা সিস্টা। মূলত ব্লফ বা ব্ল্যাক লিফ ফ্যাক্টরিগুলির কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার দাবি নিয়ে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছে এই সংগঠন। বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা চাষিরা যে সংকটের সম্মুখীন, তা নিরসনে রাজ্য সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তারা চিঠিতে উল্লেখ করেছে।
সিস্টা সূত্রে খবর, ব্লফ কারখানাগুলি ক্ষুদ্র চা চাষিদের উৎপাদিত কাঁচা পাতার সঠিক দাম দিচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নামমাত্র মূল্যে পাতা কিনে চাষিদের কার্যত অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অসাধু চক্রের কবলে পড়ে ক্ষুদ্র চাষিরা দিশেহারা। সংগঠনের দাবি, যদি সরকার ব্লফ কারখানাগুলিকে নির্দেশ দেয় যে তারা যেন বাধ্যতামূলকভাবে সিস্টার আওতাধীন চাষিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মূল্যে চা পাতা সংগ্রহ করে, তবেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। এতে চাষিরা অন্তত উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করে কিছুটা মুনাফা পাওয়ার আশা রাখতে পারবেন।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ক্ষুদ্র চা শিল্পের বিকাশে এই সিদ্ধান্ত মাইলফলক হতে পারে। চাষিদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে দালালি চক্র ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে উৎপাদিত পাতার ন্যায্য বাজারদর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে যেখানে হাজার হাজার পরিবার এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এমন বৈষম্য চললে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো আবেদনে বলা হয়েছে, ব্লফ কারখানাগুলো যাতে সিস্টা অনুমোদিত মূল্যতালিকা মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন।
সিস্টা নেতৃত্বের কথায়, আমরা চাই চাষি এবং কারখানা—উভয় পক্ষের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হোক। কিন্তু বর্তমানে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তা বন্ধ হওয়া জরুরি। ক্ষুদ্র চা শিল্প যাতে কোনোভাবে মার না খায়, তার জন্য তারা রাজ্য সরকারের কাছে একটি স্থায়ী পলিসি বা নীতি তৈরিরও আবেদন জানিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতীতেও একাধিকবার স্থানীয় স্তরে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। তাই এবার প্রশাসনিক সর্বোচ্চ স্তর থেকে হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাজ্যের চা বলয়ে ক্ষুদ্র চা চাষিদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। তাদের উৎপাদিত পাতার ওপর ভিত্তি করেই অনেক বড় বড় ফ্যাক্টরি বা ব্লফ কারখানাগুলি ব্যবসা চালাচ্ছে। অথচ মুনাফার সিংহভাগটাই চলে যাচ্ছে কারখানা মালিকদের পকেটে। সিস্টার এই পদক্ষেপ কার্যত সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বড় প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চাষিদের আশা, মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ মিললে হয়তো তাদের দীর্ঘদিনের এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে। তবে রাজ্যের প্রশাসনিক মহল এই বিষয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করেনি। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির মতামত নেওয়ার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে প্রশাসনিক স্তরে এই নিয়ে কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খুঁজতেই আগ্রহী, কিন্তু চাষিদের স্বার্থ নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।
প্রসঙ্গত, রাজ্যে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সেই নিরিখে চা শিল্পের এই দাবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি ব্লফ কারখানাগুলি সিস্টার পরামর্শ মেনে চলে, তবে বাজারের অস্থিরতা অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকারি নির্দেশিকা জারি হলে তা কঠোরভাবে কার্যকর করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। আপাতত নবান্নের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে হাজার হাজার ক্ষুদ্র চা চাষি পরিবার। যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সদর্থক বার্তা আসে, তবে ক্ষুদ্র চা শিল্পের জন্য তা হবে বড় স্বস্তির খবর। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সংগঠনটি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও আর্জি জানিয়েছে চিঠিতে।







