নিট পরীক্ষা নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্কের আঁচ এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের রাজপথে। নিট পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যে সমস্ত পড়ুয়াদের আটক করা হয়েছিল, তাদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু করেছেন রাজ্যের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি। সেই সঙ্গে ‘সিটিজেন্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস’ বা সিজেপি-র পক্ষ থেকেও একই দাবি তোলা হয়েছে। এই ঘটনায় রাজ্যের শিক্ষামহলে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় গত কয়েকদিন ধরেই নিট পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই একাধিক জায়গায় বিক্ষোভে সামিল হন পরীক্ষার্থীরা। অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশি হস্তক্ষেপে বহু পড়ুয়াকে আটক করা হয়। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, কেন্দ্রের শাসকদল ও পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ব্যর্থতার দায় চাপা দেওয়া হচ্ছে পড়ুয়াদের ওপর। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করতেই প্রশাসনের এই দমনমূলক নীতি অবলম্বন করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
বাম ছাত্র সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা জানান, “নিট পরীক্ষায় যে ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠছে, তা লক্ষ লক্ষ মেধাবী পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল। যারা এই দুর্নীতির প্রতিবাদ করছে, তাদের জেলে বন্দি না করে বরং দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। অবিলম্বে ধৃত পড়ুয়াদের মুক্তি না দিলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবে ছাত্র সমাজ।”
পাশাপাশি, নাগরিক অধিকার রক্ষা মঞ্চ সিজেপি-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পড়ুয়াদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করা কোনো অপরাধ নয়, বরং দেশের নাগরিক হিসেবে পড়ুয়ারা স্বচ্ছ পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলতেই পারে। তাদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ছাত্রছাত্রীদের আস্থা সম্পূর্ণ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এরপরেও পুলিশের লাঠি কিংবা গ্রেফতারি দিয়ে সত্যকে ঢাকা দেওয়া সম্ভব নয়।
আইনজীবী ও সমাজকর্মীদের মতে, নিট কাণ্ড যেভাবে জাতীয় স্তরে বিতর্ক তৈরি করেছে, তাতে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। অথচ প্রশাসন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। ধৃত পড়ুয়াদের আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার চিন্তাভাবনাও চলছে।
প্রসঙ্গত, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কারচুপি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই অবস্থায় রাজপথে ধৃত পড়ুয়াদের মুক্তির দাবি একদিকে যেমন বাম রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে, তেমনই বৃহত্তর সমাজেও এটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে এই আন্দোলন কতটা বেগবান হয়, সেদিকেই তাকিয়ে শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে আমজনতা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এখন পর্যন্ত ধৃতদের মুক্তির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে কতজনকে আটক করা হয়েছে বা কতজন এখনও জেল হেফাজতে রয়েছেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি তথ্য এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষামহলের একাংশের মতে, নিট বিতর্ক নিছক কোনো পরীক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা পরিকাঠামোর গভীর ক্ষতকে সামনে এনেছে। ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, যতক্ষণ না সরকার স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং ধৃত পড়ুয়াদের মুক্তি দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষোভের আগুন নেভার সম্ভাবনা নেই। পুলিশ ও প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাবের ফলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। আগামী দিনে এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের ছাত্র রাজনীতির সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
শহর জুড়ে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বাম ছাত্র নেতারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তারা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে রাজ্যজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করবেন। পড়ুয়াদের সম্মান ও সুবিচারের দাবিতে তারা কোনোভাবেই আপস করতে রাজি নন। রাজপথের এই উত্তাপ যে ক্রমশ বাড়ছে, তা স্পষ্ট।








