বিশেষ প্রতিনিধি,নয়া দিল্লি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝেই ভারতের প্রশংসা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতকে বাংলাদেশের এক ‘প্রকৃত বন্ধু’ আখ্যা দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও নিজ দেশে ফিরে যাওয়া তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে তাঁর কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা চুক্তি হয়নি।
একই সুর শোনা গেছে তাঁর ছেলে ও সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কণ্ঠেও। যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্ত হয়ে জয় জানান, ভারত সরকার তাঁর মাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও সুরক্ষা দিয়েছে। মোদী সরকারের এই ভূমিকার জন্য তিনি ও তাঁর পরিবার চিরকৃতজ্ঞ থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।
ঐতিহাসিক বন্ধন ও ভারতে অবস্থানের পটভূমি
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে তাঁর অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে দণ্ডাদেশ জারি করা হলেও, ভারতের সঙ্গে তাঁর এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের ধারায় কোনো চির ধরেনি। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সর্বদা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করেই শেখ হাসিনা আবারও ভারতকে ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছেন।
কেন আবার দেশে ফেরার ব্যাকুলতা?
ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা এর কারণ হিসেবে কয়েকটি প্রধান বিষয় তুলে ধরেছেন:
১. মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িত বহু স্মৃতি ও জাতীয় প্রতীক সম্প্রতি ধ্বংস করা হয়েছে, যা তিনি পুনরুদ্ধার করতে চান।
২.গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ: একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে দেশের মানুষের মাঝে ফিরে আসা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
৩.হুমকি উপেক্ষা করে লড়াই: ১৯৮১ সালের কথা স্মরণ করিয়ে তিনি জানান, তখনও তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং পরে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানেও প্রাণনাশের তীব্র হুমকি থাকা সত্ত্বেও দেশবাসীর সমর্থনের ওপর আস্থা রেখে তিনি ফিরতে বদ্ধপরিকর।
নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর জয়ের বার্তা
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন:
১.বিদেশি সংস্থার প্রভাব: বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে আইএসআই (ISI)-সহ বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
২.যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভারত ও আমেরিকার মধ্যকার প্রভাবের সমীকরণ নিয়ে জয় জানান, বর্তমানে ঢাকার প্রতি ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য মূলত বাণিজ্যকেন্দ্রিক। তবে যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন আসে এবং ভবিষ্যতে তা আবারও বদলাতে পারে।
।ভূ-রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মোড়
শেখ হাসিনার এই বার্তা এবং ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় এনে দিয়েছে। একদিকে ঢাকায় বর্তমান শাসনের সাথে নতুন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তৈরিতে ভারতের সুচিন্তিত পদক্ষেপ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির রূপরেখা বদলের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।








