কলকাতা: আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তোলপাড় গোটা দেশ। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও বিচার এখনও অধরা, এই অভিযোগ তুলে এবার বড় পদক্ষেপ নিল নির্যাতিতার পরিবার। অন্ধকার সরিয়ে ন্যায়ের সন্ধানে তারা প্রকাশ্যে আনল নির্যাতিতার ছবি। পরিবারের পক্ষ থেকে ফেসবুকের মাধ্যমে এই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাধারণত যৌন নিগ্রহের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখার একটি আইনি ও সামাজিক রীতি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু আরজি করের ঘটনার ভয়াবহতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি দেখে পরিবারটি মনে করছে, এবার সময় এসেছে জনসমক্ষে লড়াইকে আরও জোরালো করার। তাদের দাবি, অন্ধকার আর ছায়ার আড়ালে না থেকে লড়াইটা এবার সরাসরি সামনে থেকে লড়তে হবে। এই উদ্দেশ্যেই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্যাতিতার ছবি পোস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের মতে, বিচারের দাবিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাদের শক্তি যুগিয়েছে। তবে তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির মাঝেই তাঁরা অনুভব করেছেন যে, আন্দোলনের ঝাঁজ বজায় রাখতে একটি মুখ থাকা প্রয়োজন। ছদ্মনাম বা অস্পষ্ট অবয়বের আড়ালে না থেকে নির্যাতিতার আসল পরিচয়কে সামনে রেখেই তাঁরা এই প্রতিবাদের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দিতে চাইছেন।
ফেসবুকে শেয়ার করা ওই ছবির ক্যাপশনে ফুটে উঠেছে এক গভীর আবেগ ও সংকল্পের সুর। সেখানে বোঝানো হয়েছে যে, তাদের সন্তানকে যেভাবে শেষ করে দেওয়া হয়েছে, তার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা থামবেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা আর ছায়া হয়ে থাকতে রাজি নন। প্রকাশ্যে এসে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হওয়াই এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
এই পোস্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। চিকিৎসক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সকলেই পরিবারের এই সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে মনে করছেন, এটি কেবল একটি ছবি নয়, বরং বিচার ব্যবস্থার কাছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আরজি করের ঘটনায় যেভাবে তথ্যপ্রমাণ লোপাট বা তদন্তের মোড় ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছিল প্রথম দিকে, তার প্রেক্ষিতে পরিবারের এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
উল্লেখ্য, গত ৯ আগস্ট আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে উদ্ধার হয়েছিল ওই তরুণী চিকিৎসকের দেহ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ফুটে উঠেছিল নৃশংসতার এক চরম ছবি। এরপর কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার যায় সিবিআই-এর হাতে। একের পর এক শুনানি হলেও এবং সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায় গ্রেফতার হলেও, এর পেছনে আরও বড় কোনো চক্রান্ত বা প্রভাবশালী কেউ আছে কি না, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
পরিবারের এই সাহসী পদক্ষেপে নতুন করে আন্দোলনের জোয়ার আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মৃতার আত্মীয়রা জানিয়েছেন, সমাজের চোখে নির্যাতিতা কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকুক তা তাঁরা চান না। বরং একজন উজ্জ্বল মেধাবী চিকিৎসক হিসেবেই তাঁকে যেন সকলে মনে রাখে এবং তাঁর হয়ে সওয়াল করে, সেটাই তাঁদের কাম্য। অন্ধকার কুঠুরি থেকে বেরিয়ে ন্যায়ের আলোয় ফেরার এই লড়াই আরও কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।








