কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত আধুনিক শহর নিউ টাউনের এক বিলাসবহুল আবাসনে মধ্যরাতে পুলিশের এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়েছে। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত খবরের ভিত্তিতে পুলিশ বাহিনী যখন সেই ফ্ল্যাটে হানা দেয়, তখন সেখানে যে পরিমাণ টাকা মজুদ ছিল, তা দেখে তদন্তকারী আধিকারিকরাও হতবাক হয়ে যান। এই ঘটনায় সাতজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে গোয়েন্দাদের অনুমান, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোনো সাধারণ লেনদেনের অংশ নয়, বরং অবৈধ হাওয়ালার কারবার পরিচালনার উদ্দেশ্যেই এটি জড়ো করা হয়েছিল।
সোমবার গভীর রাতে নিউ টাউনের অভিজাত ওই আবাসনে আচমকা পুলিশি তল্লাশি শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণ তন্নতন্ন করে খোঁজার পর উদ্ধার করা হয় নগদ অর্থের পাহাড়। এই টাকা কেন এবং কী উদ্দেশ্যে নগদে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে ধৃতদের জেরা করা হচ্ছে। পুলিশি সূত্রের খবর অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন শহরের বাইরের বাসিন্দা। তারা দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিল। হাওয়ালার একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার লক্ষ্যেই এই আবাসনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টি এখন গোয়েন্দাদের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তদন্তকারী এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত বেশ কিছুদিন ধরেই ওই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছিল। মধ্যরাতের এই অভিযানে নগদ টাকার পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ডিজিটাল নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যা এই চক্রের রহস্য উন্মোচনে বড় ভূমিকা নিতে পারে। ধৃত সাতজনকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে যাতে এই চক্রের মূল হোতাকে খুঁজে পাওয়া যায়। নেপথ্যে কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে কি না, তাও গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিউ টাউনের মতো অত্যন্ত জনবহুল এবং নিরাপত্তা বেষ্টিত এলাকায় কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ টাকা গোপনে আনা হলো এবং স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী বা নিরাপত্তারক্ষীদের যোগসাজশ আছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোরদার তদন্ত শুরু হয়েছে।
আবাসনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মধ্যরাতে হঠাৎ পুলিশের বড় কনভয় দেখে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় টাকা উদ্ধারের দৃশ্য দেখে স্থানীয় মানুষ আতঙ্কিত ও হতবাক। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের আজ আদালতে পেশ করা হবে এবং তদন্তের সুবিধার্থে তাদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে। আদালতের অনুমতির পর ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হাওলা চক্রের জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তার বিস্তারিত চিত্র পরিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল ও আবাসনগুলিতে গোয়েন্দা বিভাগ বিভিন্ন সময়ে তল্লাশি চালিয়ে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করেছে। মূলত বেআইনি লেনদেন এবং হাওলা কারবারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। নিউ টাউনের এই ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক অভিযানেরই একটি অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এ ধরনের গোপন আস্তানা এবং সন্দেহজনক ফ্ল্যাটগুলোর ওপর এখন কড়া নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ।
তদন্তের স্বার্থে ধৃতদের নাম বা পরিচয় এই মুহূর্তে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশের তরফ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তদন্ত একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে এবং সম্পূর্ণ তথ্য যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই হাওলা চক্রের সঙ্গে শহরের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগ রয়েছে কি না, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া সূত্র কাজে লাগিয়ে শহরের অন্যান্য জায়গায় বড় ধরনের তল্লাশি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে পুলিশের।
শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এই ধরনের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে অবৈধ কাজের সঙ্গে যুক্তরা বর্তমানে কোণঠাসা ও আতঙ্কিত। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই সংক্রান্ত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসার আশা করছেন তদন্তকারীরা। ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতির দিকে নজর রয়েছে সব মহলের। শহরবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রশাসন জানিয়েছে, বেআইনি কার্যকলাপ রুখতে তারা বদ্ধপরিকর এবং অদূর ভবিষ্যতেই এই চক্রের সাথে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে পুলিশের তরফ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। শহরের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গোয়েন্দা বিভাগ তাদের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে।








